পুতুলনাচের ইতিকথা (উপন্যাস) – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
পুতুলনাচের ইতিকথা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃতীয় উপন্যাস এবং চতুর্থ মুদ্রিত গ্রন্থ। উপন্যাসটি ভারতবর্ষ পত্রিকায় বাংলা ১৩৪১ সালের পৌষ থেকে ১৩৪২ সালের অগ্রহায়ণ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৩৬ সালে এটি বই আকারে প্রকাশিত হয়।
নিজেদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলোর উপর যখন আমরা নিয়ন্ত্রণ হারাই তখন মনে হয় আমরা পুতুলই বৈকি। অজানা কোন এক সূতার টানে নেচে যাই, অভিনয় করে যাই জীবনের মঞ্চে।
অদ্ভুত রঙ্গমঞ্চ আমাদের এ জীবন।প্রাকৃতিক নির্বাচনের এই জগতে প্রতিটি মানুষের স্বতন্ত্র জীবন বৈচিত্র্য, নর-নারীর এক অমোঘ আকর্ষণ,যুগ যুগ ধরে টিকে থাকা ভুয়োদর্শনের উপর অন্ধবিশ্বাস,সার্থক জীবনের নামে এক মরীচিকার পিছে ছুটে চলা এইসব মিলিয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠা জীবনকে সঙ্গী করে আমাদের বেঁচে থাকা।বইটিতে মানিক বন্দোপাধ্যায় বলেছেন,এক গ্রাম্য যাপিত-জীবনের গল্প।আপাত দৃষ্টিতে যাকে বৈচিত্র্যহীন,সঙ্কীর্ণ স্বকেন্দ্রিক বলে ভুল হয়।কিন্তু মানিক দেখিয়েছেন এর মাঝেও আছে কত বৈচিত্র্য, কত রহস্য,ক্ষুদ্র-বৃহৎ ঘটনা প্রবাহের কত বিশাল প্রভাব সেখানকার মানুষগুলোর জীবনে।তারা বাস করে এক ঘোর লাগা জীবনে।সেখানে নিজেদের জীবন কেউ পরিবর্তন করতে পারেনা।নিজেদের সৃষ্ট সুতোর জালে নিজেরাই আটকে পড়ে অনেকটা পুতুলের মত নেচে যায় তারা অদৃশ্য কোন শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে।
শশী নিজের সাথেই দ্বন্দ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া পরাজিত এক সত্তা।হৃদয়,আবেগের বশবর্তী হয়েও সে চায় যুক্তি দ্বারা জীবন চালনা করতে।তাই সে বারবার নিজের কাছে নিজেই পরাজিত হয়।কুসুম শশীকে ভালোবাসে।সামাজিক বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করেও শশীকে প্রেম নিবেদন করে নানা উপায়ে।কিন্তু শশীর বিক্ষিপ্ত মনের অস্থিরতা তার অনুভূভুতিগুলোকে অবহেলা করে।মৃত্যু ঘটে কুসুমের হৃদয়ের।প্রকৃতপক্ষে মানবসৃষ্ট এই সঙ্কীর্ণ সমাজে আমরা অনেকেই শশীর মতই বেঁচে থাকি।নিজের আবেগকে জোর করে অবদমিত করি সামজিকতা নামক এক দুর্ভেদ্য যুক্তির জালে জড়িয়ে।
ঘোর লাগিয়েছে কুমুদের বোহেমিয়ান জীবনধারা।অনর্থক চাওয়া-পাওয়ার জালে আটকে পড়া এ জীবনকে এক চমৎকার অর্থহীন অর্থ দিয়ে ফেলেছে সে।প্রত্যাশার পাহাড় অবহেলা করে বেঁচে থাকাকে রূপ দিয়েছে এক গতিশীল কাব্যে,এক ছন্নছাড়া জাদুবাস্তবতায়।জীবন মানে তার কাছে শুধু কোন কিছুর মোহে ছুটে বেড়ানো নয়,বরং নির্মোহ এক প্রত্যাশায় জীবনকেই ছুটিয়ে বেড়ানো।
যাদবের ঘটনার মধ্য দিয়ে মানিক আমাদের জানিয়ে গেছেন সত্যের মোড়কে ঢাকা এক ভয়াবহ মিথ্যের গল্প। সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে উঁচু আসনে অধিষ্ঠিত থাকবার আশায় স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করে ধন্বন্তরি পুরুষ! যুগ যুগ ধরে হয়তোবা এভাবেই টিকে আছে আপাত দৃষ্টিতে পাপ-পতনের হাত থেকে জীবনকে বাঁচিয়ে চলার নামে জীবনকে সঙ্কীর্ণ করে ফেলা কোন ভুয়োদর্শন। “মিথ্যারও হয়তোবা মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করে দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্য সত্য হয়েও থাকতে পারে মিথ্যা।" এই লাইনগুলো আমার ভিতরটাকে ভীষণ ভাবে নাড়া দেয়। প্রশ্ন জাগায়!
গোপালের চরিত্র আমাদের দেখিয়েছে ভয়াবহ স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক এক মানুষের জীবনযাত্রাকে।যারা সুখ খোঁজে অর্থ-সম্পদে,ক্ষমতার প্রকাশে।আর চায় এসবের মাঝেই তাদের অস্তিত্বকে অমর করতে।
নানা বিচিত্র চরিত্রের জীবনধারার মাঝে আরো আছে মতির মত অপরিণত,আবেগী নারীর গল্পকথা, পরাণের মত উত্তাপহীন জীবনমুখী চরিত্র,আছে ভালোবাসার ভুল মায়ায় জড়ানো জয়ার জীবনকাহিনীও।
জীবনের নানা বিচিত্র ভাবপ্রবণতা,নানা শ্রেণী ও সমাজের ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের গল্পগাঁথা,যুক্তি দিয়ে জীবন চালাতে গিয়ে হৃদয়ের মৃত্যু এসবই মানিক অত্যন্ত মুন্সীয়ানার সাথে ফুটিয়ে তুলেছেন এই কালজয়ী উপন্যাসে। পৃথিবীর অন্য কোথাও হয়তোবা অন্য প্রেক্ষাপটেই মঞ্চস্থ হয় এই নাটক। কুশীলব আলাদা হলেও যার ঘটনার প্রবাহ একইদিকে।
এই বই মনের এক কোণে কেন যেন একটা হাহাকারের সুর বাজিয়ে দেয়। আসলেই কি আমরা তাহলে পুতুল?নিয়তির অদৃশ্য শক্তির দ্বারা চালিত এক অনিবার্য স্রোতের টানে ভেসে চলেছি?নাকি আমাদের ভয়,জীবন সম্পর্কে অজ্ঞতা,বিকাশের পথে নিজেদেরই সৃষ্ট অন্তরায় এসবই আমাদের পুতুল বানিয়ে নাচাচ্ছে? সমাজ,সংসার সব কি আসলেই মিছে?জীবনের ভার বয়ে নিরন্তর শুধু শুন্যতার দিকেই ছুটে চলা?নাকি ক্ষুদ্র এ জীবনকে নিজের মত করে স্বার্থপর বানিয়ে বেঁচে থাকা?
লেখা - https://www.amazon.com/gp/product/B08B4TTSNY/ref=x_gr_bb_kindle?caller=Goodreads&tag=x_gr_bb_kindle-20
বইয়ের রিভিউ পড়ুন এখানে।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন